স্যার ফজলে হাসান আবেদ

স্যার ফজলে হাসান আবেদ: ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্বপরিবর্তনের পথিকৃৎ

জন্ম ও শৈশব

স্যার ফজলে হাসান আবেদ ১৯৩৬ সালের ২৭ এপ্রিল বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদন করার ইচ্ছা ছিল তার মধ্যে প্রবল।

ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠা

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্র্যাক (BRAC)। এই সংস্থা এখন বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও। এর কার্যক্রম বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আফ্রিকা ও এশিয়ার আরও ১১টি দেশে বিস্তৃত হয়েছে। ব্র্যাক শুধু একটি দারিদ্র্য বিমোচন সংস্থাই নয়, এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নারী ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক উন্নয়নের জন্য একটি সফল মডেল।

নারী ক্ষমতায়নে তার অবদান

স্যার ফজলে হাসান আবেদ নারীদের ক্ষমতায়নের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার জন্য তৃণমূল পর্যায়ে কাজ শুরু করেন। তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত “কিশোরী ক্লাব” নারীদের শিক্ষিত ও কর্মক্ষম করার জন্য একটি অনন্য মডেল। এই ক্লাবগুলোর মাধ্যমে নারীরা সামাজিক নেতৃত্বে আসার সুযোগ পেয়েছেন এবং অনেকে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়েছেন।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ভূমিকা

তিনি বিশ্বাস করতেন যে শিক্ষাই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। তাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য অ-প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি, গ্রামীণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ব্র্যাক স্বাস্থ্য কর্মসূচি চালু করে, যা পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা পায়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

স্যার ফজলে হাসান আবেদ ব্রিটেনের রানীর কাছ থেকে নাইট উপাধি লাভ করেন। তিনি র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারসহ দেশি-বিদেশি অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। তার উন্নয়ন মডেল আজও বিভিন্ন দেশে অনুসরণ করা হয়।

মানবিক নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত

তার সহকর্মী ও সমসাময়িকরা তাকে সবসময় “আবেদ ভাই” বলে সম্বোধন করতেন। তার সম্পর্কে ড. মুহাম্মদ ইউনুস বলেন, “বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে তার সঙ্গে জড়িত।” এই বক্তব্য তার কাজের গভীরতা এবং বিস্তৃতি বোঝায়।

শেষ বিদায়

২০১৯ সালের ২০ ডিসেম্বর স্যার ফজলে হাসান আবেদ পরলোক গমন করেন। তার মরদেহ নিয়ে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সকল স্তরের মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আদর্শ।

উপসংহার

স্যার ফজলে হাসান আবেদের জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে দূরদর্শী চিন্তাভাবনা, পরিশ্রম এবং মানবকল্যাণের জন্য নিবেদন দিয়ে একটি দেশ এবং বিশ্ব পরিবর্তন করা যায়। তিনি তার কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে উন্নয়ন শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার একটি প্রচেষ্টা। তার জীবন ও আদর্শ আগামী প্রজন্মের জন্য চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *